সেই ইটেই গড়লেন ভবিষ্যৎ-মাটির ঘরেই বিদায় সাদেক আলীর
যে মানুষটি নিজের ঘর বানানোর ইট দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি স্কুল, সেই মানুষটি আজ চলে গেলেন নীরবে-মাটির ঘরেই জীবন কাটিয়ে, মাটির ঘরেই শেষ আশ্রয়ে শুয়ে। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ডাকরা গ্রামের শিক্ষানুরাগী সাদেক আলী সরকার আর নেই। শনিবার তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। বিকেলে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ডাকরা ডিগ্রি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাজা-যে মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন আলোকিত মানুষের।
১৯৭২ সালের সেই সময়টা ছিল সংকট আর সম্ভাবনার। ডাকরা দ্বিপার্শ্ব উচ্চবিদ্যালয় যাত্রা শুরু করলেও মাথা গোঁজার মতো কোনো পাকা ঘর ছিল না। ঠিক তখনই নিজের বাড়ি তৈরির জন্য পোড়ানো ইটগুলো সাদেক আলী সরকার তুলে দিলেন বিদ্যালয়ের হাতে। নিজের সংসারের কথা এক পাশে রেখে, নিজের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করলেন পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট একটি পাকা স্কুল ভবন। যে ইট দিয়ে তাঁর নিজের ঘর হওয়ার কথা ছিল, সেই ইটেই দাঁড়িয়ে গেল গ্রামের শিক্ষার ভিত্তি।
সেই থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। টানা ১৮ বছর বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ১৯৯৪ সালে নিজের তিন বিঘা জমি দান করে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ডাকরা কলেজ। তিনিই হন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সময়ের পরিক্রমায় সেই কলেজ আজ ডিগ্রি কলেজ-কিন্তু প্রতিষ্ঠাতার জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
যে মানুষটি শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ে দিলেন, তিনি নিজে রয়ে গেলেন একটি ভাঙাচোরা মাটির ঘরে। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ডাকরা গ্রামে তাঁর সেই ঘর আজও দাঁড়িয়ে আছে—ইট নেই, বাথরুম নেই, সামনের দিকে বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি একটি অতিরিক্ত ঘরই ছিল তাঁর শেষ সংযোজন। নিজের জন্য পাকা ঘর করার সুযোগ এলেও তিনি কখনো রাজি হননি।
২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল তাঁর এই আত্মত্যাগের গল্প জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয় ‘নিজের বাড়ি না করে যিনি বানিয়েছেন স্কুল কলেজ’ শিরোনামে। বয়সের ভারে অসুস্থ হয়ে পড়ার আগপর্যন্ত তিনি কলেজের হিতৈষী সদস্য হিসেবে প্রতিদিন নিয়ম করে কলেজে যেতেন। শুধু উপস্থিত থাকাই নয়, শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়া, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, এমনকি কলেজের নির্মাণকাজ—সবই নিজের কাজের মতো করে দেখভাল করতেন।
কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ বলেন, সাদেক আলী সরকার ছিলেন নীরব অভিভাবকের মতো। কোনো শিক্ষক ক্লাসে না গেলে তিনি খোঁজ নিতেন, শিক্ষার্থীরা বাজারে ঘোরাঘুরি করলে ধরে এনে ক্লাসে বসাতেন। তাঁর চোখে কলেজ ছিল নিজের সন্তানের মতো।
৫৫ বছর আগে যে স্বপ্ন ছিল নিজের একটি পাকা বাড়ির, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তাঁর ছোট ভাই আমির হামজা জানান, তিনি একাধিকবার ভাইকে পাকা ঘর বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু সাদেক আলী সরকার কখনোই রাজি হননি। সাত কন্যা ও এক পুত্রের জনক হয়েও, ছেলের বিয়ের পর বাড়তি জায়গার প্রয়োজন হলে বাঁশের চাটাই দিয়ে সামনের দিকে আরেকটি ঘর তুলেই সন্তুষ্ট ছিলেন।
যে মানুষটি অস্থায়ী মাটির ঘরে থেকেও স্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত সেই মাটির ঘর ছেড়ে চলে গেলেন চিরস্থায়ী মাটির ঘরে। রেখে গেলেন কোনো সম্পদ নয়, রেখে গেলেন আলোকিত মানুষের সারি আর আত্মত্যাগের এক অনন্য ইতিহাস—যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে করিয়ে দেবে, মানুষের আসল বড়ত্ব ঘরের ইটে নয়, হৃদয়ের ইচ্ছায়।