জামিন ছাড়াই খুনের আসামিদের মুক্তি
জামিননামা ছাড়াই হত্যা মামলার তিন আসামিকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছেড়ে দেওয়া-এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং দেশের কারা ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থা, দায়িত্বহীনতা ও সম্ভাব্য ভয়ংকর অনিয়মের নগ্ন উদাহরণ। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা শুধু কারা কর্তৃপক্ষকেই নয়, পুরো বিচার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বিকেলে হত্যা মামলার তিন আসামি জামিন ছাড়াই কারাগার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হলে কারা প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কিন্তু আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এত বড় ঘটনার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে নেই কোনো দায় স্বীকারের দৃঢ়তা, বরং রয়েছে দায় এড়ানোর চেনা ভাষা-“ভুল করে হয়ে গেছে”।
ময়মনসিংহের সিনিয়র জেল সুপার মো. আমিনুল ইসলাম ঘটনাকে ‘ভুলমুক্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হত্যা মামলার আসামির মুক্তি কি এমন কোনো কাগজপত্রের ওপর নির্ভর করে, যা একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চোখ বন্ধ করে সই করে দিতে পারেন? প্রডাকশন ওয়ারেন্ট আর জামিননামার মতো মৌলিক নথির পার্থক্য না বোঝা যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে তা সরাসরি পেশাগত অযোগ্যতার প্রমাণ। আর যদি এটি নিছক ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও ভয়াবহ।
কারা বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন্স) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রডাকশন ওয়ারেন্টকে জামিননামা ভেবে আসামিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং এ ঘটনায় ডেপুটি জেলার জাকারিয়া ইমতিয়াজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—একজন ডেপুটি জেলার কি এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আছে? নাকি এর পেছনে আরও কেউ ছিল, যাদের আড়াল করতেই তদন্তের আগেই একজনকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে?
আরও গুরুতর বিষয় হলো, আসামিদের মুক্তির বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হয়নি। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আব্দুল্লাহ আল মামুন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পুলিশ বিষয়টি জানত না। এর অর্থ, হত্যা মামলার আসামিরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে—যার দায় কে নেবে?
এই ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একজন বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার আগে যে বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাইয়ের কথা, তা কোথায় ছিল? নিরাপত্তা প্রটোকল, রেজিস্টার, আদালতের আদেশ যাচাই—সবই কি একসঙ্গে অকার্যকর হয়ে গেল?
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা শুনতে আশ্বাসের মতো শোনালেও বাস্তবতা হলো—এ ধরনের ঘটনায় অতীতেও বহু তদন্ত কমিটি হয়েছে, কিন্তু দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। ফলে তদন্ত কমিটি আদৌ সত্য উদঘাটন করবে, নাকি ঘটনাটি ‘দায়সারা প্রতিবেদন’-এ চাপা পড়বে—সেই সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, এটি কেবল তিনজন আসামির অবৈধ মুক্তির ঘটনা নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। যদি হত্যা মামলার আসামিরা এভাবে ‘ভুল করে’ কারাগার থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়? কারা ব্যবস্থার এই ভয়াবহ ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত ছাড়া জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।