স্বীকৃতি ও সমান অধিকারের দাবিতে সরব তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিকরা
রাজশাহীতে ভোটকেন্দ্রে ছিল উৎসবের আমেজ। তবে সেই আনন্দের ভিড়ের মাঝেই ধরা পড়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার চিহ্ন। সব বাধা অতিক্রম করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। তাঁদের কণ্ঠে ছিল দৃঢ় উচ্চারণ—“আমরা পিছিয়ে পড়া নই, আমাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে নগরের শিরোইল কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে ছিল ভোটারদের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই আলাদা করে নজর কাড়েন কয়েকজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। কারও পরনে শাড়ি, কারও সালোয়ার-কামিজ; মুখে হালকা সাজ। নাগরিক দায়িত্ব পালনের আনন্দ তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট। তবে সবার অভিজ্ঞতা একরকম ছিল না-কেউ সহজেই ভোট দিয়েছেন, আবার কেউ পড়েছেন নানা বিড়ম্বনায়।
রাজশাহীর ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘের’ কোষাধ্যক্ষ মিস জুলি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ভোট দেন। কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে। জয়-পরাজয় থাকবেই, তবে যেই নির্বাচিত হোক, সে যেন মানুষের জন্য কাজ করে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তাঁদের পিছিয়ে পড়া বলা হলেও বাস্তবে সমাজই তাঁদের পিছিয়ে রেখেছে। সুযোগের অভাব ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে তাঁরা প্রান্তিক হয়ে আছেন। অথচ দেশের উন্নয়নে তাঁরা সমানভাবে ভূমিকা রাখতে চান। কাউকে বাদ রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়-এ কথাই জোর দিয়ে বলেন তিনি।
তবে ভোট দিতে গিয়ে জুলিকে দাঁড়াতে হয়েছে পুরুষদের লাইনে। জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘পুরুষ’ হিসেবে নিবন্ধিত থাকায় তাঁকে সেই সারিতেই অপেক্ষা করতে হয়। নারীসুলভ পোশাক ও পরিচয়ে পুরুষদের লাইনে দাঁড়ানো তাঁর জন্য ছিল বিব্রতকর অভিজ্ঞতা। তাই লাইন ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে ভোট দেন তিনি। তাঁর দাবি, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের পরিচয় ও মর্যাদা ভোটার তালিকায় নিশ্চিত করতে হবে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মিঠু নামের আরেক ভোটার। তিনি বলেন, আলাদা কোনো সারি না থাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবু নাগরিক হিসেবে ভোট দিতে পেরে স্বস্তি পেয়েছেন। আগে তাঁকে পুরুষ হিসেবে নিবন্ধন করা হলেও এখন সরকারিভাবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি থাকায় ভোটার তালিকাতেও সেই পরিচয় চান তিনি।
মিস রীতার অভিজ্ঞতা ছিল আরও দুর্ভোগের। কখনো চারতলা, কখনো তিনতলায় পাঠানো হয়েছে তাঁকে। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে ঘুরতে হয়েছে বারবার। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়েও সঠিক তথ্য না পাওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েন তিনি। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা অস্বাভাবিক নন; অন্য সবার মতোই স্বাভাবিকভাবে ভোট দিতে চান। এই বৈষম্যের অবসান চান তিনি।
হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা এলাকায় ভোট চাইতে এলেও তাঁদের বাড়িতে খুব কমই যান। পাশের বাড়িতে কড়া নাড়লেও তাঁদের দরজায় কড়া নাড়েন না অনেকেই। এমনকি এখনো কেউ কেউ প্রশ্ন করেন-তাঁদের আদৌ ভোটাধিকার আছে কি না। জুলির কথায়, “আমাদেরও ভোট আছে”-এ কথাটি এখনো বলতে হয়।
‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় এক হাজার ২০০ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত এক হাজার ভোটার হলেও নানা সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতায় খুব কমসংখ্যকই নিয়মিত ভোট দিতে পারেন।
ভোটকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতি শুধু একটি সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ নয়; এটি স্বীকৃতি, মর্যাদা ও সমঅধিকারের দাবিরও প্রতীক। হাসিমুখে ভোট দিয়ে বেরিয়ে আসা এই মানুষগুলোর বার্তা স্পষ্ট-তাঁরা প্রান্তিক নন; তাঁরা এই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক। সুযোগ ও সম্মান নিশ্চিত হলে উন্নয়নের ধারায় তাঁরাও সমানভাবে অংশ নিতে প্রস্তুত।