চারঘাটে সহায়ক বইয়ের নামে বছরে সাড়ে ৫ কোটি টাকার বাণিজ্য
সরকার প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দিচ্ছে, যাতে অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে। কিন্তু বাস্তবে সরকারি বইয়ের বাইরেই গড়ে উঠেছে আরেকটি অদৃশ্য শিক্ষাব্যবস্থা। সহায়ক বইয়ের নামে গাইড, গ্রামার ও ব্যাকরণ বইয়ের বিশাল বাণিজ্য এখন শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলায় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়ংকর এক চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক সমিতি, প্রকাশনী সংস্থা, কিছু শিক্ষক ও লাইব্রেরি মালিকদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া, কম নম্বর দেওয়া কিংবা প্রশ্ন কমন না পাওয়ার ভয় দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকরা।
বছরে সাড়ে ৫ কোটি টাকার বই বিক্রি :-
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫৮টি, মাদ্রাসা সাতটি ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান ১৭টিসহ মোট ৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
সরেজমিন বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার ও সহায়ক বই মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকার প্যাকেজ কিনতে হচ্ছে। নবম শ্রেণিতে সেই প্যাকেজের মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৯০০ টাকা। শ্রেণিভেদে গড়ে ৩ হাজার টাকা ধরে হিসাব করলে চারঘাট উপজেলায় বছরে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার গাইড ও সহায়ক বই বিক্রি হচ্ছে।
পিরোজপুর গ্রামের অভিভাবক আফরোজা বেগম বলেন,সরকার বই ফ্রি দিচ্ছে, কিন্তু স্কুল আবার কয়েক হাজার টাকার বইয়ের তালিকা ধরিয়ে দিয়েছে। দুই মেয়ের বই কিনতে ঋণ করতে হয়েছে।
‘নির্ধারিত বই না কিনলে প্রশ্ন কমন পাবে না’:-
নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করার কথা থাকলেও জনবল ও ব্যয়ের অজুহাতে অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে সমিতিভুক্ত বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় একই ধরনের প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার ৫৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৬টি বিদ্যালয় নিয়ে গঠিত শিক্ষক সমিতির একটি অংশ শিক্ষার্থীদের ‘লেকচার পাবলিকেশন’-এর বই কিনতে বাধ্য করছে। শিক্ষার্থীদের বলা হচ্ছে, সমিতির পরীক্ষার প্রশ্ন ওই প্রকাশনীর বই থেকেই করা হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক সমিতির এক নেতা জানান, লেকচার পাবলিকেশনের সঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। তবে শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,২৭ লাখ টাকার চুক্তির বিষয়টি গুজব। বইয়ের মান ভালো হওয়ায় সেগুলো পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করে লেকচার পাবলিকেশনের উপজেলা প্রতিনিধি রবিউল ইসলাম বলেন, কাউকে বই কিনতে বাধ্য করা হয়নি।
অন্যদিকে নয়টি বিদ্যালয় নিয়ে গঠিত আরেকটি শিক্ষক সমিতি ‘অনুপম পাবলিকেশন’-এর বইয়ের তালিকা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট এক প্রতিনিধি বলেন, “আমরা কাউকে বই কিনতে বাধ্য করি না। শিক্ষকদের চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়।
ক্লাসে সরকারি বই নয়, চলে গাইড:-
চারঘাটের একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়সহ উপজেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বছরের শুরুতে এক প্রকাশনীর বই কিনলেও পরে শিক্ষকদের চাপে অন্য প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঞ্জেরী প্রকাশনীর ‘অক্ষরপত্র’ সিরিজের বই কিনতে উৎসাহিত করেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক ব্যক্তিগত টিউশনির সঙ্গেও জড়িত বলে জানা গেছে।
অভিভাবক লালন আলী বলেন,একবার বই কিনে দিয়েছি। এখন আবার নতুন সিরিজ কিনতে বলছে। ধারদেনা করে আবার বই কিনতে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানায়, “স্যারদের কথামতো বই না কিনলে নম্বর কম দেওয়া হবে-এমন ভয় সবার মধ্যেই কাজ করে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিক্ষক শামীম আলম চৌধুরী। তিনি বলেন,শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য সহায়ক বইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কাউকে বাধ্য করা হয়নি।অক্ষরপত্র সিরিজের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ আসার পর ওই বই কিনতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজগর হোসেন বলেন, প্রকাশনীগুলো সমিতির নেতাদের কমিশন দেয়। এরপর শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর বই চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন ওই বই থেকে হবে—এমন ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হচ্ছে।
সরদহ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাতুনে রাহে নাজাত বলেন,শিক্ষকদের এ ধরনের পরামর্শ না দিতে বলা হয়েছে। এরপরও কেউ ব্যক্তিগতভাবে করলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
আইন আছে, প্রয়োগ নেই:-
২০০৮ সালে উচ্চ আদালত নোট ও গাইডনির্ভর শিক্ষা বন্ধে নির্দেশনা দেন। শিক্ষা আইনের খসড়াতেও শিক্ষার্থীদের বাণিজ্যিক বই কিনতে বাধ্য করাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই আইন কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বাদশা বলেন, যখন শিক্ষক নিজেই নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই চাপিয়ে দেন, তখন শিক্ষা আর শিক্ষা থাকে না, এটি ব্যবসায় পরিণত হয়।
সুজন চারঘাটের সভাপতি মো.আবুল কালাম আজাদ বলেন,সরকারি পাঠ্যবইয়ের বাইরে নির্দিষ্ট গাইড চাপিয়ে দেওয়া জাতীয় শিক্ষানীতির পরিপন্থি। ভয়ভীতি দেখিয়ে বই কিনতে বাধ্য করা অনৈতিক এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার।
উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার রাহেদুল ইসলাম বলেন, “সরকার শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় বই বিনামূল্যে দিচ্ছে। বই নিয়ে বাণিজ্যের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রাহাতুল করিম মিজান বলেন,সরকারি বইয়ের বাইরে নির্দিষ্ট বই নিয়ে বাণিজ্য অনৈতিক। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাকে জ্ঞানার্জনের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে যদি তা বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। চারঘাটের এই চিত্র শুধু একটি উপজেলার নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও একটি সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন সচেতন মহল।