জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাস দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান নাহিদ ইসলামের
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর একক রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত না করে এর প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, গণভবনে অবস্থিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে কেবল দলীয় প্রচারণার ক্ষেত্র না বানিয়ে জাতীয় ইতিহাস চর্চার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর গণভবনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বর্তমান প্রদর্শনীর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনীতে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট অংশ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এবং কিছু পরিচিত মুখ ও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অথচ এই গণ-অভ্যুত্থানের বিস্তৃত পরিসরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সাহসী ভূমিকা সমানভাবে প্রশংসার দাবিদার। সময়ের ধারাবাহিকতায় আন্দোলনের প্রতিটি পর্যায়, নির্যাতন ও প্রতিরোধের সেই ইতিহাসগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে জাদুঘরে স্থান দিতে হবে।
অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দলীয়করণের যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে—সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেন এই রাজনৈতিক নেতা। তিনি বলেন, সরকারের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের বয়ান বদলে ফেলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন এই অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে নিজেদের আত্মোপলব্ধির অংশ হিসেবে ধারণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাদুঘরের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর জন্য যেখানে অন্তত ২০০ জন জনবল প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন। স্বেচ্ছাসেবী ও স্বল্প জনবলের ওপর ভর করে চলা এই ব্যবস্থার কারণে জাদুঘরের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কাঠামোর পরিবর্তে জাদুঘর পরিচালনায় স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণকারী বিশেষজ্ঞ ও শুরু থেকে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞদের মূল্যায়ন করে একটি দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে।
পরিদর্শনকালে প্রদর্শনীতে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের ছবি না থাকার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন নাহিদ ইসলাম। এ সময় কর্তৃপক্ষ তাকে জানায় যে, শহীদ আবু সাঈদকে ঘিরে একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র বা চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা পরবর্তীতে জাদুঘরে প্রদর্শিত হবে। এছাড়া শহীদদের পরিবারের কাছ থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ স্মৃতিচিহ্ন আরও নান্দনিক ও শৈল্পিকভাবে প্রদর্শনের তাগিদ দেন তিনি। পুরো ১৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত গণভবনের এই স্থাপনাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করে গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ও নিদর্শনগুলো বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সবশেষে, ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যেন বাদ না পড়ে, সেদিকে ইঙ্গিত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সীমান্ত হত্যা ও বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আন্দোলন ও বিজয়ের প্রকৃত চিত্রও জাদুঘরে সযত্নে সংরক্ষিত থাকা উচিত। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা এড়িয়ে গিয়ে কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় ইতিহাস তৈরি করা সম্ভব নয়।