গাইবান্ধা কারাগারে জেলার মুনির ও পিআই আরিফের বেপরোয়া সিন্ডিকেট
আইনত কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও গাইবান্ধা জেলা কারাগার রূপ নিয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি, খাদ্য কেলেঙ্কারি এবং বেপরোয়া অর্থ বাণিজ্যের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে। আদালতের জামিন আদেশ আটকে রেখে অর্থ আদায়, কারা হাসপাতালের শয্যা বরাদ্দ বাণিজ্য, বন্দিদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী ও সরকারি ওষুধ খোলাবাজারে বিক্রি এবং প্রতিবাদী বন্দিদের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কারা প্রশাসনের প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে। খোদ জেলার মুহাম্মদ মুনির হোসাইন ও নিজেকে আইজি প্রিজন্সের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচয় দেওয়া প্রধান কারারক্ষী পিআই আরিফের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ বন্দি, তাদের স্বজন এমনকি সাধারণ কারারক্ষীরাও।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ৪ জুন খুলনা জেলা কারাগার থেকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে বদলির আদেশ পান জেলার মুহাম্মদ মুনির হোসাইন। পরবর্তীতে ৩০ জুন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে যোগদান করেন। নোয়াখালী জেলার বাসিন্দা এই কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পিআই আরিফের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ৮ থেকে ১০ জন চিহ্নিত দাগি বন্দিকে নিয়ে তারা বিশেষ এক ক্যাডার বাহিনী তৈরি করেছেন। এই বাহিনীর মাধ্যমে পুরো কারাগারের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সাধারণ বন্দিরা কোনো অন্যায় বা নিম্নমানের সেবার প্রতিবাদ জানালেই তাদের ওপর নেমে আসে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত-পা বেঁধে শাস্তিমূলক ‘লকাপ’ বা অন্ধকার সেলে বন্দি রেখে নির্যাতনের মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে।
কারাগারের ভেতরের এই অনিয়মে সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কারা হাসপাতাল। নিয়ম অনুযায়ী গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের সেখানে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সুস্থ ও বিত্তশালী অপরাধীরা হাসপাতালের আরামদায়ক শয্যা ভাড়া নিয়ে বিলাসী সময় কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে দিনমজুর বা সাধারণ বন্দিরা মারাত্মক অসুস্থ হলেও তাদের ভাগ্যে নূন্যতম চিকিৎসাও জুটছে না। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়া এক বন্দি জানান, হাসপাতালে শয্যা পেতে হলে পিআই আরিফের নির্ধারিত লোকজনের কাছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা তুলে দিতে হয়। তাছাড়া সরকারিভাবে সরবরাহকৃত অ্যান্টিবায়োটিকসহ মূল্যবান ওষুধ বন্দিদের না দিয়ে রাতের আঁধারে বাইরে স্থানীয় কিছু ফার্মেসিতে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
কারাগারের অভ্যন্তরে খাদ্য সরবরাহ ও রেশনের বণ্টনেও চলছে অবিশ্বাস্য কারসাজি। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারের মাধ্যমে সরবরাহকৃত চাল, ভোজ্যতেল, মসলা, মাছ ও মাংসের বড় একটি অংশ সাধারণ বন্দিদের পাতে পৌঁছায় না। বরাদ্দকৃত সামগ্রী কৌশলে সরিয়ে নিয়ে কারা ক্যান্টিনের ব্যবসায় যুক্ত করা হচ্ছে। যেখানে কারা ক্যান্টিনের সামগ্রী ক্রয় ও বিক্রয়ের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হিসাব থাকার বিধান রয়েছে, সেখানে সরকারি বরাদ্দের খাবারেই ক্যান্টিন পরিচালনা করে সেই খাবার চড়া মূল্যে সাধারণ বন্দিদের কাছে বিক্রি করে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র। ফলে সাধারণ বন্দিদের প্রতিদিনের খাবার হিসেবে জুটছে দুর্গন্ধযুক্ত পচা সবজি ও অত্যন্ত নিম্নমানের মোটা চালের ভাত।
সবচেয়ে মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে জামিনে মুক্তির প্রক্রিয়া ঘিরে। বিজ্ঞ আদালত থেকে জামিননামা কারাগারে এসে পৌঁছালেও বন্দিদের সহজে মুক্তি মেলে না। নথিপত্রে নামের বানান ভুল, ঠিকানায় অসঙ্গতি কিংবা তথ্যের ঘাটতির অজুহাত তুলে ফাইল আটকে রাখা হয়। জামিনপ্রাপ্তদের স্বজনদের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে মুক্তি বিলম্বিত করা হয়। রাজনৈতিক মামলার বন্দিদের ক্ষেত্রে এই হয়রানি আরও প্রকট। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত অর্থ না পেলে কারা ফটক থেকে বের হওয়া মাত্রই বিশেষ কৌশলে বন্দিদের পুনরায় অন্য মামলায় ফাঁসিয়ে আটক করানোর ভয় দেখানো হয়।
কারা ফটকের সামনে কথা হয় জামিনে মুক্ত হওয়া এক যুবকের স্বজনের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে জামিনের কাগজ কারাগারে পৌঁছানোর পরও ফাইল ছাড়তে দুই দিন ঘুরানো হয়েছে। পরবর্তীতে পিআই আরিফের মধ্যস্থতাকারীকে ৫ হাজার টাকা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়। টাকা না দিলে নথিতে ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখার প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
কারাগারের এমন সার্বিক বিশৃঙ্খলায় সাধারণ কারারক্ষীদের মধ্যেও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। দায়িত্ব পালনকারী একজন সাধারণ কারারক্ষী আক্ষেপ করে জানান, জেলার মুনির হোসাইন ও পিআই আরিফের সিন্ডিকেটের কারণে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারারক্ষীদের ভেতরে ডিউটি বণ্টন, ছুটি মঞ্জুর কিংবা লকাপ তদারকিতেও পিআই আরিফের কথাই শেষ কথা। কেউ অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললে তাকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি বা বিভাগীয় ব্যবস্থার ভয় দেখানো হয়। খোদ সহকারী প্রধান কারারক্ষী বা সুবেদার পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এই সিন্ডিকেটের ক্ষমতার দাপটে কোণঠাসা।
গাইবান্ধা কারাগার ঘিরে বন্দি নির্যাতন ও রহস্যজনক মৃত্যুর ইতিহাস নতুন নয়। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে কারাবন্দি অবস্থায় পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পলাশবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ শামিকুল ইসলাম লিপন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে ২০২৩ সালের শেষদিকে ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক মুন্না ও আওয়ামী লীগ নেতা তারিক রিফাতও এই কারাগারের হেফাজতে থাকা অবস্থায় প্রাণ হারান। এছাড়া ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এক নারী হাজতিকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর তিন কারারক্ষীকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছিল এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে জেল সুপারের ব্যক্তিগত বাসভবন থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি পালিয়ে যাওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছিল।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান কারারক্ষী পিআই আরিফের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে গাইবান্ধা জেলা কারাগারের জেলার মুহাম্মদ মুনির হোসাইন বলেন, কারাগারে কোনো অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই। খাদ্য বণ্টন, জামিন প্রক্রিয়াকরণ এবং চিকিৎসাসেবা সরকারি বিধান মেনে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কারাগারের শৃঙ্খলা জোরদার করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, কতিপয় স্বার্থান্বেষী চক্রের অনৈতিক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালাচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন মহলের মতে, কারাবিধি লঙ্ঘন করে বন্দিদের ওপর চালানো নির্যাতন এবং প্রকাশ্য অর্থবাণিজ্য বন্ধ করতে অনতিবিলম্বে কারা অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে সংশোধনাগারের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পুরোপুরি ভূলুণ্ঠিত হবে।