রাজশাহীর ফসল নাটোরে পাচার, কৃষক বন্দি মিল ব্যবস্থাপনার ফাঁদে
রাজশাহী ও নাটোরের সীমান্তঘেঁষা চিনি শিল্প এলাকায় নীরবে গড়ে উঠছে একটি সংগঠিত অপরাধ সাম্রাজ্য-যার মূল পুঁজি কৃষকের ঘাম ঝরানো আখ, আর যার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি সুগার মিলের সময়সূচিগত বৈষম্য ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা। রাজশাহী সুগার মিল এলাকার আখ নাটোরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে চলে যাওয়ার অভিযোগ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান আখ পাচার, ব্ল্যাক ট্রেড ও স্বার্থান্বেষী একটি চক্রের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী সুগার মিল দেরিতে চালু হওয়ায় বাঘা উপজেলার সুলতানপুর ও গড়গড়ি এলাকার চরাঞ্চলের কৃষকরা মারাত্মক সংকটে পড়েন। আখ কেটে সময়মতো বিক্রি না করতে পারলে যেমন ফসলের মান নষ্ট হয়, তেমনি পরবর্তী মৌসুমের আলু ও অন্যান্য অর্থকরী ফসল চাষেও বিপর্যয় নেমে আসে। এই দুর্বল মুহূর্তেই সক্রিয় হয়ে ওঠে অপরাধ সাম্রাজ্যের দালালচক্র, যারা আত্মীয়তার নাম ব্যবহার করে, ভুয়া পরিচয় ও ভিন্ন এলাকার সার্ভে দেখিয়ে রাজশাহীর আখ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে ঢুকিয়ে দেয়।
রাজশাহী সুগার মিলের ডিজিএম (সিপিই) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন স্পষ্ট করে বলেন, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তার ভাষায়, নর্থ বেঙ্গল মিল রাজশাহী মিলের অন্তত ২১ দিন আগে চালু হয় এবং সেই সময়েই গড়গড়ি ও সুলতানপুর এলাকার আখ তাদের ক্রয়কেন্দ্রে টেনে নেয়। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এই বক্তব্যের সত্যতাও মিলেছে।
সুলতানপুর ও গড়গড়ি ইক্ষু ক্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, মিল দেরিতে খোলার সুযোগে কৃষকরা বাধ্য হয়ে আখ অন্য মিলে বিক্রি করছেন এবং এই স্রোত ঠেকানোর মতো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা তাদের হাতে নেই। অথচ নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা শুধু নিজস্ব সার্ভে করা কৃষকদের আখই গ্রহণ করে। তবে ‘নিজের নামে নয়, অন্যের নামে’ আখ বিক্রির প্রবণতা যে বাস্তবে ঘটছে, তা কৃষকদের দেখানো বিল ও কাগজপত্রেই স্পষ্ট।
এই অপরাধ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এতে প্রকৃত কৃষকরা ন্যায্যতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যাদের আত্মীয়স্বজন বা দালালের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, তারা মাসে একাধিক চিট পায়, আর যাদের সে সুযোগ নেই তারা কম দামে বা দেরিতে আখ বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে একই করপোরেশনের অধীনে থাকা দুটি মিলের ব্যবস্থাপনাগত বৈষম্য একটি অঘোষিত অবৈধ বাজার তৈরি করেছে, যেখানে আখ হয়ে উঠেছে পাচারের পণ্য।
চরাঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, বন্যা, নদীভাঙন আর উৎপাদন খরচের চাপে এমনিতেই আখ চাষ লাভজনক নয়। তার ওপর মিল দেরিতে খোলা মানে তাদের জন্য আরেকটি আর্থিক ধাক্কা। অনেকেই স্বীকার করেছেন, বাধ্য হয়ে আত্মীয়ের নাম ব্যবহার করে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে আখ দিতে হয়েছে, যা আইনত অনিয়ম হলেও বাস্তবতায় এটি বেঁচে থাকার কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের আওতায় থাকা দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত মিলের মধ্যে এই সময়সূচির অমিলই অপরাধ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। কৃষকদের ভাষায়, এক মাসের ব্যবধানেই কোটি টাকার আখের গতিপথ বদলে যায়, জন্ম নেয় ব্ল্যাক ট্রেড, আর মিল ব্যবস্থাপনায় নেমে আসে অনিয়ম ও অবিচার।
কৃষকদের একটাই দাবি—রাজশাহী ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল একই সময়ে চালু করতে হবে। তা না হলে এই আখ পাচার, দালালচক্র ও অপরাধ সাম্রাজ্য আরও শক্তিশালী হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রকৃত কৃষক, আর রাষ্ট্র হারাবে স্বচ্ছ ও ন্যায্য চিনি উৎপাদনের সুযোগ।