সোমবার , ০৩ আগস্ট ২০২৬
হোমরাজশাহীমৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের

মৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের

favicon
শাহিনুর সুজন , স্টাফ রিপোর্টার:
মৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার রেললাইন। ১৯১৫ সালে স্থাপিত এই সিঙ্গেল লাইন দিয়েই আজও সারাদেশের সঙ্গে রাজশাহীর রেল যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে। এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই রেলপথ এখনো রাজশাহীর জন্য একমাত্র কার্যকর রেল করিডর। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই লাইনের আরেকটি ভয়ংকর পরিচয় তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে। এটি যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুর রেলপথে পরিণত হচ্ছে।

প্রতিদিন এই লাইনে ১৫টি ট্রেন ৩০ বার যাতায়াত করে। এর মধ্যে ঢাকাগামী বনলতা, সিল্কসিটি, পদ্মা, ধুমকেতু ও মধুমিতা এক্সপ্রেস, খুলনাগামী কপোতাক্ষ ও সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস এবং রংপুরগামী তিতুমীর, বরেন্দ্র ও বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে লোকাল ট্রেন ও মালবাহী ট্রেনও চলাচল করে। ব্যস্ত এই রেলপথেই প্রায় নিয়মিত ঘটছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা।

ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই লাইন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২৬টি মরদেহ। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯-এ। আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই উদ্ধার হয়েছে ১৭টি মরদেহ। পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এই রুটে একটি করে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থানায় শুধু অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করা হয়। অধিকাংশ মরদেহের ময়নাতদন্তও করা হয় না। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যাচ্ছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ কিংবা মানসিক চাপে কেউ আত্মহত্যা করলেও তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। আবার পূর্ব শত্রুতা বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে হত্যার পর মরদেহ রেললাইনে ফেলে রাখার ঘটনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু হত্যা মামলা কিংবা ময়নাতদন্ত না হওয়ার কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

গত ২১ এপ্রিল গভীর রাতে চারঘাটের নিমপাড়া ইউনিয়নের কালাবিপাড়া এলাকায় সোহাগ আলী (২৬) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি কালাবিপাড়া এলাকার জালাল উদ্দিনের ছেলে। ট্রেনে দুই পা কাটা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।


জালাল উদ্দিন বলেন,আমার ছেলে এলাকার কিছু মানুষের সঙ্গে মাদক সেবন করত। আমাদের ধারণা, এসব নিয়ে দ্বন্দ্বে তাকে মেরে ট্রেনের নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বিচার আল্লাহর কাছে চেয়েছি। থানায় মামলা করে নতুন করে কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে চাইনি। এজন্য মামলাও হয়নি, মরদেহের ময়নাতদন্তও হয়নি।


এর আগে আড়ানী রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশের রেললাইন থেকে মাহফুজুর রহমান মিশন (২৫) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি বাঘা উপজেলার নওটিকা গ্রামের মৃত গাজিউর রহমানের ছেলে।

মিশনের মা মুল্লিকা বেওয়া বলেন, “আগের দিন রাত ৮টার দিকে মোবাইল ফোনে আমার সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে বলছিল, কে বা কারা তার চোখ-মুখ বেঁধে রেখেছে। ‘আমাকে বাঁচাও’ বলতেই ফোন কেটে যায়। পরে রেললাইন থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”

এ ঘটনাতেও থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে, কোনো হত্যা মামলা হয়নি।


স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, কিছু ঘটনায় মরদেহের অবস্থা দেখে সন্দেহ হয়। কিন্তু তদন্ত হয় না, ময়নাতদন্তও হয় না। ফলে সত্যটা চাপা পড়ে যায়। মৃত ব্যক্তির পরিবারও মামলায় আগ্রহ দেখায় না, প্রশাসনও অনেক সময় চুপ থাকে।


রাজশাহী জেলা জজকোর্টের আইনজীবী রাকিব সরকার বলেন,প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত জরুরি। কারণ ট্রেনে কাটা পড়া মৃত্যুর আড়ালে অন্য অপরাধ লুকিয়ে থাকতে পারে। যেটা ময়নাতদন্ত ছাড়া জানা সম্ভব নয়।


স্থানীয়দের মতে, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, আর্থিক সংকট, প্রেমঘটিত সমস্যা কিংবা মানসিক চাপে বিপর্যস্ত মানুষ সহজ পথ হিসেবে রেললাইন বেছে নিচ্ছেন। দ্রুতগতির ট্রেন এবং নির্জন পরিবেশের কারণে অনেকেই পরিকল্পিতভাবে রেললাইনে গিয়ে আত্মহত্যা করছেন।

গত ২২ এপ্রিল চারঘাটের হলিদাগাছী রেলগেট এলাকায় রাজশাহী থেকে খুলনাগামী মহানন্দা এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন লাকি বেগম (৫০) নামে এক নারী। তিনি উপজেলার মুংলি গ্রামের জাম্মান আলীর স্ত্রী। স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক অশান্তির কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন। ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়ার আগে প্রায় এক ঘণ্টা রেললাইনের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় তাকে।


গত বছরের ১৪ এপ্রিল পেঁয়াজচাষী রুহুল আমিনের আত্মহত্যার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করে লোকসানে পড়ে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। সেদিন সকাল থেকেই তিনি আড়ানী রেলস্টেশনে অবস্থান করছিলেন। বিকেলে ধূমকেতু এক্সপ্রেস স্টেশনে পৌঁছালে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একজন ইউটিউবারের ক্যামেরায় ধারণ করা সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট উপজেলা সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন,রেললাইনে মৃত্যু কিংবা মরদেহ উদ্ধার এখন অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রেললাইনের আশপাশে কাউকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখলে স্থানীয়দের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় সঠিক তদন্ত ও ময়নাতদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।


৬০ কিলোমিটার লাইনের মধ্যে সরদহ স্টেশন থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্থানীয়রা। এই অংশে ঘনবসতি, অবৈধ পারাপারের রাস্তা এবং রেললাইনের পাশে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


গত ২২ ও ২৩ এপ্রিল দুই দিনে এই ১৫ কিলোমিটার এলাকাতেই তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন,এই অংশের নন্দনগাছী স্টেশন এক যুগ ধরে বন্ধ। এছাড়া আড়ানী ও সরদহ স্টেশনে পর্যাপ্ত জনবল নেই। ফলে স্টেশন ও রেললাইন ঘিরে মাদক কারবারি ও অপরাধীদের একটি জগত তৈরি হয়েছে। এতে দ্বন্দ্ব ও মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে।


হলিদাগাছী এলাকার বাসিন্দা মিঠন আলী বলেন,রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো রেলগেট বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেই। ফলে মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশা কিংবা পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।


এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, টহল জোরদার এবং স্টেশনগুলোতে জনবল বাড়ানোর দাবি উঠেছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সেলিং ও সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম চালুর পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরদহ স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ইকবাল কবির বলেন,স্টেশনে রাতে মাত্র তিনজন জনবল থাকে। কিছুদিন আগে এখানে রাতে একজন নারীকে ধর্ষণের ঘটনাও আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা স্টেশন ছেড়ে বাইরে নজরদারি করতে পারি না। ইদানীং মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা কিছুটা বেড়েছে।


ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমান বলেন,২২ ও ২৩ এপ্রিল উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের কোনোটিরই ময়নাতদন্ত হয়নি। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরিবার না চাইলে আমরা জোর করে ময়নাতদন্ত করতে পারি না। তবে রেললাইনে যেকোনো অপরাধ দমনে আমরা তৎপর আছি।


বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন,আত্মহত্যা পুরোপুরি রোধ করা কঠিন। তবে অসতর্ক চলাচলের কারণে মৃত্যুর ঘটনা কমাতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও নির্দেশিকা স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে রেললাইনে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ চলছে।

মৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
www.dailyupochar.com
০২ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উপচার
 সোমবার , ০৩ আগস্ট ২০২৬
হোমরাজশাহীমৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের

মৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের

favicon
শাহিনুর সুজন , স্টাফ রিপোর্টার:
মৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সরদহ স্টেশন থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার রেললাইন। ১৯১৫ সালে স্থাপিত এই সিঙ্গেল লাইন দিয়েই আজও সারাদেশের সঙ্গে রাজশাহীর রেল যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে। এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই রেলপথ এখনো রাজশাহীর জন্য একমাত্র কার্যকর রেল করিডর। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই লাইনের আরেকটি ভয়ংকর পরিচয় তৈরি হয়েছে গত কয়েক বছরে। এটি যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুর রেলপথে পরিণত হচ্ছে।

প্রতিদিন এই লাইনে ১৫টি ট্রেন ৩০ বার যাতায়াত করে। এর মধ্যে ঢাকাগামী বনলতা, সিল্কসিটি, পদ্মা, ধুমকেতু ও মধুমিতা এক্সপ্রেস, খুলনাগামী কপোতাক্ষ ও সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস এবং রংপুরগামী তিতুমীর, বরেন্দ্র ও বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রুটে লোকাল ট্রেন ও মালবাহী ট্রেনও চলাচল করে। ব্যস্ত এই রেলপথেই প্রায় নিয়মিত ঘটছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা।

ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই লাইন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২৬টি মরদেহ। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯-এ। আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই উদ্ধার হয়েছে ১৭টি মরদেহ। পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই এই রুটে একটি করে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থানায় শুধু অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা করা হয়। অধিকাংশ মরদেহের ময়নাতদন্তও করা হয় না। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যাচ্ছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ কিংবা মানসিক চাপে কেউ আত্মহত্যা করলেও তা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। আবার পূর্ব শত্রুতা বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে হত্যার পর মরদেহ রেললাইনে ফেলে রাখার ঘটনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু হত্যা মামলা কিংবা ময়নাতদন্ত না হওয়ার কারণে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

গত ২১ এপ্রিল গভীর রাতে চারঘাটের নিমপাড়া ইউনিয়নের কালাবিপাড়া এলাকায় সোহাগ আলী (২৬) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি কালাবিপাড়া এলাকার জালাল উদ্দিনের ছেলে। ট্রেনে দুই পা কাটা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।


জালাল উদ্দিন বলেন,আমার ছেলে এলাকার কিছু মানুষের সঙ্গে মাদক সেবন করত। আমাদের ধারণা, এসব নিয়ে দ্বন্দ্বে তাকে মেরে ট্রেনের নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বিচার আল্লাহর কাছে চেয়েছি। থানায় মামলা করে নতুন করে কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে চাইনি। এজন্য মামলাও হয়নি, মরদেহের ময়নাতদন্তও হয়নি।


এর আগে আড়ানী রেলস্টেশনের পশ্চিম পাশের রেললাইন থেকে মাহফুজুর রহমান মিশন (২৫) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি বাঘা উপজেলার নওটিকা গ্রামের মৃত গাজিউর রহমানের ছেলে।

মিশনের মা মুল্লিকা বেওয়া বলেন, “আগের দিন রাত ৮টার দিকে মোবাইল ফোনে আমার সঙ্গে শেষ কথা হয়। সে বলছিল, কে বা কারা তার চোখ-মুখ বেঁধে রেখেছে। ‘আমাকে বাঁচাও’ বলতেই ফোন কেটে যায়। পরে রেললাইন থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”

এ ঘটনাতেও থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে, কোনো হত্যা মামলা হয়নি।


স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, কিছু ঘটনায় মরদেহের অবস্থা দেখে সন্দেহ হয়। কিন্তু তদন্ত হয় না, ময়নাতদন্তও হয় না। ফলে সত্যটা চাপা পড়ে যায়। মৃত ব্যক্তির পরিবারও মামলায় আগ্রহ দেখায় না, প্রশাসনও অনেক সময় চুপ থাকে।


রাজশাহী জেলা জজকোর্টের আইনজীবী রাকিব সরকার বলেন,প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত জরুরি। কারণ ট্রেনে কাটা পড়া মৃত্যুর আড়ালে অন্য অপরাধ লুকিয়ে থাকতে পারে। যেটা ময়নাতদন্ত ছাড়া জানা সম্ভব নয়।


স্থানীয়দের মতে, পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, আর্থিক সংকট, প্রেমঘটিত সমস্যা কিংবা মানসিক চাপে বিপর্যস্ত মানুষ সহজ পথ হিসেবে রেললাইন বেছে নিচ্ছেন। দ্রুতগতির ট্রেন এবং নির্জন পরিবেশের কারণে অনেকেই পরিকল্পিতভাবে রেললাইনে গিয়ে আত্মহত্যা করছেন।

গত ২২ এপ্রিল চারঘাটের হলিদাগাছী রেলগেট এলাকায় রাজশাহী থেকে খুলনাগামী মহানন্দা এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন লাকি বেগম (৫০) নামে এক নারী। তিনি উপজেলার মুংলি গ্রামের জাম্মান আলীর স্ত্রী। স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক অশান্তির কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন। ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়ার আগে প্রায় এক ঘণ্টা রেললাইনের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় তাকে।


গত বছরের ১৪ এপ্রিল পেঁয়াজচাষী রুহুল আমিনের আত্মহত্যার ঘটনাও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করে লোকসানে পড়ে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। সেদিন সকাল থেকেই তিনি আড়ানী রেলস্টেশনে অবস্থান করছিলেন। বিকেলে ধূমকেতু এক্সপ্রেস স্টেশনে পৌঁছালে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। একজন ইউটিউবারের ক্যামেরায় ধারণ করা সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট উপজেলা সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন,রেললাইনে মৃত্যু কিংবা মরদেহ উদ্ধার এখন অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রেললাইনের আশপাশে কাউকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখলে স্থানীয়দের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় সঠিক তদন্ত ও ময়নাতদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।


৬০ কিলোমিটার লাইনের মধ্যে সরদহ স্টেশন থেকে আড়ানী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্থানীয়রা। এই অংশে ঘনবসতি, অবৈধ পারাপারের রাস্তা এবং রেললাইনের পাশে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


গত ২২ ও ২৩ এপ্রিল দুই দিনে এই ১৫ কিলোমিটার এলাকাতেই তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন,এই অংশের নন্দনগাছী স্টেশন এক যুগ ধরে বন্ধ। এছাড়া আড়ানী ও সরদহ স্টেশনে পর্যাপ্ত জনবল নেই। ফলে স্টেশন ও রেললাইন ঘিরে মাদক কারবারি ও অপরাধীদের একটি জগত তৈরি হয়েছে। এতে দ্বন্দ্ব ও মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে।


হলিদাগাছী এলাকার বাসিন্দা মিঠন আলী বলেন,রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো রেলগেট বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেই। ফলে মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশা কিংবা পথচারীরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।


এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, টহল জোরদার এবং স্টেশনগুলোতে জনবল বাড়ানোর দাবি উঠেছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সেলিং ও সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম চালুর পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরদহ স্টেশনের স্টেশন মাস্টার ইকবাল কবির বলেন,স্টেশনে রাতে মাত্র তিনজন জনবল থাকে। কিছুদিন আগে এখানে রাতে একজন নারীকে ধর্ষণের ঘটনাও আলোচিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা স্টেশন ছেড়ে বাইরে নজরদারি করতে পারি না। ইদানীং মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা কিছুটা বেড়েছে।


ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমান বলেন,২২ ও ২৩ এপ্রিল উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের কোনোটিরই ময়নাতদন্ত হয়নি। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরিবার না চাইলে আমরা জোর করে ময়নাতদন্ত করতে পারি না। তবে রেললাইনে যেকোনো অপরাধ দমনে আমরা তৎপর আছি।


বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন,আত্মহত্যা পুরোপুরি রোধ করা কঠিন। তবে অসতর্ক চলাচলের কারণে মৃত্যুর ঘটনা কমাতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ও নির্দেশিকা স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে রেললাইনে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ চলছে।

মৃত্যুর রেলপথ সরদহ-ঈশ্বরদী,আড়াই বছরে প্রাণ গেল ৭৫ জনের
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
www.dailyupochar.com
০২ আগস্ট ২০২৬