শিথিলতার সুযোগে অপরাধীদের প্রত্যাবর্তন
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত এই বিশেষ অভিযান শুরুর সময় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য ছিল স্পষ্ট-সন্ত্রাসী, অস্ত্রবাজ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে হবে সর্বাত্মক আঘাত। শুরুতে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা দেখে জনমনে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা হতাশাজনক এবং উদ্বেগজনক।
প্রথম দফার অভিযান শেষ হওয়ার পর কার্যত ‘ডেভিল হান্ট’ নামটাই হারিয়ে যায়। নিয়মিত অভিযান চলার দাবি থাকলেও মাঠের বাস্তবতায় দেখা যায় শিথিলতা। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো-গ্রেফতার হওয়া অপরাধীদের একটি বড় অংশ জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়া। এমনকি সাম্প্রতিক এক আলোচিত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তি আগেই ডেভিল হান্টে গ্রেফতার হয়েছিলেন-এই তথ্য পুরো অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি অপরাধী ধরে, আর বিচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে তারা বেরিয়ে এসে আবার রক্ত ঝরায়, তাহলে সেই অভিযানের অর্থ কী?
ডিসেম্বরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে সরকার বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় দফা ডেভিল হান্ট ঘোষণা করে। স্বল্প সময়ে বিপুল গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য আবারও প্রমাণ করেছে-ইচ্ছা থাকলে রাষ্ট্র কঠোর হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কঠোরতা কি টেকসই হবে, নাকি আগের মতোই কিছুদিন পর তা ঢিলে হয়ে যাবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বড় অভিযান শেষ হলে প্রশাসনিক উদ্যমও শেষ হয়ে যায়, আর অপরাধীরা সুযোগ বুঝে আবার মাথাচাড়া দেয়।
বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হলো আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন মানেই সহিংসতার আশঙ্কা। থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এখনো পুরোপুরি উদ্ধার না হওয়া এবং অবৈধ অস্ত্রের অবাধ চলাচল এই আশঙ্কাকে আরও বাস্তব করে তুলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শিথিল হলে অপরাধীরা শুধু সক্রিয়ই হবে না, তারা নির্বাচনকে পুঁজি করে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে-এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।
এখানে দায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের বিষয়ে চোখ বন্ধ রাখার সংস্কৃতিও সমানভাবে দায়ী। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে যারা অপরাধ করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে কোনো অভিযানই সফল হতে পারে না। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে এই বাস্তবতার স্বীকৃতি থাকলেও প্রশ্ন রয়ে যায়-কথা আর কাজের মধ্যে ফারাক কমবে কবে?
অপারেশন ডেভিল হান্ট এখন আর নামের জৌলুসে চলতে পারে না। এটিকে হতে হবে ফলাফলভিত্তিক। গ্রেফতারের পাশাপাশি দ্রুত বিচার, জামিন নীতিতে কঠোরতা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে শূন্য সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা-এই চারটি জায়গায় একযোগে আঘাত না এলে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হবে না।
রাষ্ট্র যদি এখনো দৃঢ় না হয়, তবে এর মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে-নিরাপত্তাহীনতা, সহিংসতা আর অনিশ্চিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ডেভিল হান্ট যদি সত্যিই ‘ডেভিল’ দমন করতে চায়, তবে শোডাউন নয়, চাই স্থায়ী কঠোরতা এবং জবাবদিহি। এখনই সিদ্ধান্তের সময়-নইলে পরিস্থিতি রাষ্ট্রের হাতের বাইরে চলে যাওয়ার দায় কেউ এড়াতে পারবে না।
লেখক :-
মো:নুরে ইসলাম মিলন
সভাপতি
জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা রাজশাহী বিভাগ।
যুগ্ম-সম্পাদক
রাজশাহী প্রেসক্লাব।