আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায় প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
দেশের ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায়ভার প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পদে বহাল রেখে দেশে স্বাভাবিক ও নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি এবং শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন এবং গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় অসংলগ্ন বক্তব্য উপস্থাপন করছেন। রাষ্ট্র সংস্কারের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণামূলক অবস্থান নিয়েছেন বলে দাবি করেন বিরোধীদলীয় এই নেতা। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়, তখন তিনি দায়িত্বশীল উত্তর না দিয়ে সেগুলোকে রাজপথ বা পল্টনের বক্তব্য আখ্যা দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
রাজধানীর সাম্প্রতিক কয়েকটি অপ্রীতিকর ঘটনার উদাহরণ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে যে তাণ্ডব ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এতে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা ও একজন নারী সংসদ সদস্যের নাম আসার পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকা প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী। একইভাবে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায়ও প্রশাসনের চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তা দৃশ্যমান হয়েছে। রাজধানীর বুকে প্রকাশ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অরাজকতা চলবে আর প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি আরও দাবি করেন, একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হলে মব কালচার বন্ধ হবে এবং নাগরিক জীবনে নিরাপত্তা ফিরে আসবে—এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমান সরকার গঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ক্ষমতাসীন দল নিজেদের তৃণমূল নেতাকর্মীদের দখলদারি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই বাস্তবতায় রাজপথে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য দলীয় নেতাকর্মীসহ আপামর জনসাধারণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক ভিন্নমতের যোগ্য প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে অতীতের মতোই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দলীয়করণের অপচেষ্টা চলছে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ থেকে বাদ পড়া আড়াই হাজার প্রার্থীর অবিলম্বে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সুস্পষ্ট রাষ্ট্রবিরোধী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ ছাড়া কাউকেই অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের অধিকার আদায়ে এনসিপি সবসময় রাজপথে সোচ্চার থাকবে।
রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিষয়ে তিনি বলেন, অহেতুক কালক্ষেপণ করে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চলছে। মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো লোকদেখানো সংস্কার প্রক্রিয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি গ্রহণ করবে না। এ লক্ষ্যে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা ডাকার জোর দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওই ভাষণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, জনআকাঙ্ক্ষা, সীমান্ত হত্যা, রোহিঙ্গা সমস্যা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কিংবা বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটের মতো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট মৌলিক ইস্যুগুলো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কারসাজি বা ইঞ্জিনিয়ারিং করার পাঁয়তারা হলে তা শক্ত হাতে প্রতিহত করা হবে। তরুণ নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে এনসিপি প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনে দখলদার ও চাঁদাবাজদের মুখোমুখি দাঁড়াবে। একইসঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক বা দলীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট ঘোষণা দাবি করেন তিনি।