সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে নতুন গণভোটের উদ্যোগ
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধন প্রশ্নে নতুন করে দেশব্যাপী সাংবিধানিক গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। তবে সরকারের এই উদ্যোগকে পূর্ববর্তী গণভোটের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো। বিরোধীদের অভিযোগ, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে সুস্পষ্ট রায় দিয়েছে। এখন সরকার নিজস্ব আঙ্গিকে সংবিধান পরিবর্তন করে পূর্বের সেই ঐতিহাসিক জনরায়কে বাতিল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কমিটির বৈঠক শেষে সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮ ও ৫৬ সহ স্পর্শকাতর মৌলিক বিষয়গুলোতে সংসদ কোনো রূপান্তর আনলে তা কার্যকর করতে জনগণের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। আওয়ামী লীগ সরকারের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত হওয়া ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোট বিধানটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আদালতের আদেশে পুনর্বহাল হয়েছে। ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলে পরবর্তী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে বিল উত্থাপন করা হবে এবং বিল অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পূর্বে তা চূড়ান্ত গণভোটে যাবে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান সরকারের এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, জনগণ ইতিমধ্যে গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ম্যান্ডেট দিয়েছে, অথচ ক্ষমতাসীনরা তা কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করতে চাইছে না। নতুন করে গণভোট ডেকে আগের রায় বাতিল করার প্রক্রিয়াকে তিনি গণতন্ত্রের জন্য চরম আঘাত বলে উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানান, সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে একত্রে কোনো গণভোটের রায়কে টেকনিক্যাল গণভোট হিসেবে গণ্য করা যায় না এবং বিরোধী দল প্রক্রিয়ায় অংশ না নিলে একতরফাভাবেই এগোতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞ ও সংবিধান প্রণেতারাও এই প্রশ্নে ভিন্ন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, আদালতের রায়ের মাধ্যমে কোনো বিধান পুনর্বহাল হলে তার জন্য আলাদা করে সংসদে নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা থাকে না, যা অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়ের নজির থেকেও স্পষ্ট। একই মত দিয়ে ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিক জানান, উচ্চ আদালতের আদেশের আলোকেই সংবিধানে গণভোটের বিধান কার্যকর হয়ে গেছে। তবে ১৪২ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সামগ্রিক আইনি অবস্থান পর্যালোচনা করা সমীচীন হবে। সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনি পরামর্শক তানিম হোসেন শাওন মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের আলোকে সরাসরি সংবিধান সংস্কার করাই ছিল সবচেয়ে আইনসিদ্ধ পথ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিরোধী শিবিরের নেতারা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ১২ নভেম্বর জারিকৃত আদেশের আওতায় অনুষ্ঠিত গণভোটে 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হলেও ক্ষমতাসীন দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম ও এনসিপির নীতিনির্ধারকদের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট ম্যান্ডেট ও ঐকমত্যকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পুরো রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়াকে সংকীর্ণ দলীয় কাঠামোর ভেতরে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। এর ফলে সাংবিধানিক সংকট নিরসনের বদলে রাজপথের রাজনৈতিক সংঘাত ও মেরুকরণ আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।