ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত প্রস্থান
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বিপুল সামরিক ব্যয় এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির পর অবশেষে ইরাক থেকে সবশেষ সামরিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ইরাকে অবশিষ্ট থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের শেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও সব সেনাসদস্যকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থানকে নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক লড়াইয়ের ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করছে ইরান এবং দেশটির সমর্থনপুষ্ট স্থানীয় সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদে নির্ধারিত ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনাটি বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন লাভ করল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই এই প্রত্যাহার কার্যকর হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাদের মতে, মার্কিন বাহিনীর শূন্যতার সুযোগে ইরাকের রাষ্ট্রকাঠামো, রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে তেহরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অবদমিত উগ্রপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলেও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
ইরানঘনিষ্ঠ শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গবেষক জাসিম আল-বাহাদলি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ইরাকের রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি একটি পরোক্ষ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। সেই জোটের বিদায়ের ফলে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাবে ইরান ও তাদের মিত্র মিলিশিয়া বাহিনীগুলো।
এদিকে ইরানপন্থি সশস্ত্র জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর শীর্ষ কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন বাহিনীর এই প্রস্থানকে দেশের ওপর বিদেশি আগ্রাসনের অবসান ও প্রতিরোধ আন্দোলনের চূড়ান্ত সফলতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তবে সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও দেশটির সব পক্ষ এই মুহূর্তে মার্কিন প্রস্থানকে সম্পূর্ণ ইতিবাচকভাবে দেখছে না।
মার্কিনবিরোধী লড়াইয়ের একসময়কার প্রাণকেন্দ্র ফালুজার সুন্নি গোত্রীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাইসহ অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পুরোপুরি নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য ইরাকি সামরিক কাঠামো এখনও যথেষ্ট সুসংহত নয়। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের মাধ্যমে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অভিযানের পর ২০১১ সালে একবার সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে আইএসের বর্বর বিস্তার ঠেকাতে ইরাকি বাহিনীর অনুরোধে আবারও আন্তর্জাতিক জোট নিয়ে দেশটিতে ফিরে আসতে বাধ্য হয় পেন্টাগন।
ইরাকের কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বড় উদ্বেগ হলো আইএসের ‘স্লিপার সেল’গুলোর সম্ভাব্য সক্রিয়তা। কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি সতর্ক করে জানান, মার্কিন ড্রোন নজরদারি, রিকনেসাঁ ও গোয়েন্দা তথ্যের জোগান বন্ধ হলে আত্মগোপনে থাকা জঙ্গিরা নিজেদের সক্ষমতা জাহির করতে মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।
ইতিমধ্যে কৌশলগত তেলনগরী কিরকুকসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মঘাতী নাশকতার পরিকল্পনাসহ একাধিক গোপন তৎপরতার প্রমাণ পেয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। ফলে মার্কিন বাহিনীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরাকে একটি দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের অবসান ঘটলেও দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা নাকি নতুন অস্থিরতার সূচনা হতে চলেছে-তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।