মঙ্গলবার , ০৪ আগস্ট ২০২৬
হোমসারাদেশটমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

টমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

favicon
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি :
টমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য



রাজশাহীর গোদাগাড়ী এখন দেশের টমেটো উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র-অনেকে একে ডাকছেন ‘টমেটোর রাজ্য’। মাঠজুড়ে টমেটোর ফলন, জমি থেকেই বিক্রি, সারাদেশে সরবরাহ-সব মিলিয়ে দৃশ্যমান এক নীরব বিপ্লব ঘটলেও এর আড়ালে রয়ে গেছে গভীর সংকট, অনিশ্চয়তা আর অব্যবস্থাপনার গল্প। টমেটো চাষ ও বাজারজাতকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও দাম ওঠানামা, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজের অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষকের ভাগ্যের চাকা এখনও কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘোরেনি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে গোদাগাড়ীতে টমেটো উৎপাদনে বড় ধরনের উত্থান-পতন ঘটেছে, তবে আবাদি জমির পরিমাণ খুব একটা বাড়েনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়ে উৎপাদন ছিল ৫৮ হাজার ৫৯৫ মেট্রিক টন, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৫ হেক্টরে এবং উৎপাদন হয় ৮৭ হাজার ৪৩৫ টন। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ করে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৪ হাজার ৭৬০ টন। গড়ে ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলে সম্ভাব্য আয় দাঁড়াবে ১১২ কোটির বেশি। এসব উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্তত ৮ হাজার কৃষক।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দাম কখনো খুব বেশি, কখনো হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকির মধ্যেই চাষ করছেন। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় বিপুল পরিমাণ টমেটো সংরক্ষণ করা যায় না, ফলে অনেক সময় পচে নষ্ট হচ্ছে উৎপাদিত ফসল। এতে করে লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন বাড়লেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় লাভের নিশ্চয়তা নেই।

গোদাগাড়ীর মহিশালবাড়ী এলাকার কৃষক সুমন আলী বলেন, এখন মাঠ থেকেই টমেটো বিক্রি হয়ে যায়। আগে মাঠের পাশে টমেটো পড়ে থাকতে দেখা যেত, এখন আর তা হয় না। ব্যবসায়ীরা জমিতে এসে কিনে নিয়ে যান। লাভ হয়, তবে সব বছর এক রকম না। কখনো ভালো দাম, কখনো লোকসান-এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চাষ করতে হয়।

মৌসুমের শুরু থেকেই গোদাগাড়ীর হেলিপ্যাড, সিএন্ডবি, রেলগেট, হাবাসপুর, গোপালপুর, কাঁকনহাট, মহিশালবাড়ী, বসন্তপুর, চর আষাড়িয়াদহ ও পিরিজপুরসহ অন্তত ৫০টি এলাকা পরিণত হয়েছে টমেটো পাঁকানোর অস্থায়ী হাবে। কাঁচা টমেটো রোদে শুকানো হচ্ছে, আবার খড় দিয়ে ঢেকে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই লাল রং ধারণ করা এসব টমেটো পাঠানো হচ্ছে নাটোর, বগুড়া, নওগাঁ, ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

এই টমেটো ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে অস্থায়ী ঘর তুলে বা ভাড়া নিয়ে ফাঁকা জমি বর্গা করে টমেটো পাঁকানোর কাজ করছেন। ফলে শুধু টমেটো মৌসুমেই গোদাগাড়ীতে অস্থায়ীভাবে ৯ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, বছরে দুই দফা টমেটো চাষ হয় এখানে, যার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন টমেটো সবচেয়ে লাভজনক। এ বছর কিছু গ্রীষ্মকালীন টমেটো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহমেদ বলেন, গোদাগাড়ীতে টমেটো চাষ এখন শুধু কৃষি নয়, একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যের পাশাপাশি হাজারো মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে। তবে কোল্ড স্টোরেজ, পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই নীরব বিপ্লব টেকসই হবে না।

টমেটোর রাজ্যে তাই আজ একদিকে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের জোয়ার, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা, মূল্যঝুঁকি ও কৃষকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এই বৈপরীত্যই গোদাগাড়ীর টমেটো বিপ্লবের অদৃশ্য সংকট।

টমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
www.dailyupochar.com
৩০ জানুয়ারি ২০২৬
দৈনিক উপচার
 মঙ্গলবার , ০৪ আগস্ট ২০২৬
হোমসারাদেশটমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

টমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য

favicon
গোদাগাড়ী প্রতিনিধি :
টমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য



রাজশাহীর গোদাগাড়ী এখন দেশের টমেটো উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র-অনেকে একে ডাকছেন ‘টমেটোর রাজ্য’। মাঠজুড়ে টমেটোর ফলন, জমি থেকেই বিক্রি, সারাদেশে সরবরাহ-সব মিলিয়ে দৃশ্যমান এক নীরব বিপ্লব ঘটলেও এর আড়ালে রয়ে গেছে গভীর সংকট, অনিশ্চয়তা আর অব্যবস্থাপনার গল্প। টমেটো চাষ ও বাজারজাতকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হলেও দাম ওঠানামা, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজের অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে কৃষকের ভাগ্যের চাকা এখনও কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘোরেনি।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত সাত বছরে গোদাগাড়ীতে টমেটো উৎপাদনে বড় ধরনের উত্থান-পতন ঘটেছে, তবে আবাদি জমির পরিমাণ খুব একটা বাড়েনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়ে উৎপাদন ছিল ৫৮ হাজার ৫৯৫ মেট্রিক টন, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৫ হেক্টরে এবং উৎপাদন হয় ৮৭ হাজার ৪৩৫ টন। সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে টমেটো আবাদ করে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৪ হাজার ৭৬০ টন। গড়ে ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলে সম্ভাব্য আয় দাঁড়াবে ১১২ কোটির বেশি। এসব উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত অন্তত ৮ হাজার কৃষক।

কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। দাম কখনো খুব বেশি, কখনো হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকির মধ্যেই চাষ করছেন। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় বিপুল পরিমাণ টমেটো সংরক্ষণ করা যায় না, ফলে অনেক সময় পচে নষ্ট হচ্ছে উৎপাদিত ফসল। এতে করে লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন বাড়লেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় লাভের নিশ্চয়তা নেই।

গোদাগাড়ীর মহিশালবাড়ী এলাকার কৃষক সুমন আলী বলেন, এখন মাঠ থেকেই টমেটো বিক্রি হয়ে যায়। আগে মাঠের পাশে টমেটো পড়ে থাকতে দেখা যেত, এখন আর তা হয় না। ব্যবসায়ীরা জমিতে এসে কিনে নিয়ে যান। লাভ হয়, তবে সব বছর এক রকম না। কখনো ভালো দাম, কখনো লোকসান-এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই চাষ করতে হয়।

মৌসুমের শুরু থেকেই গোদাগাড়ীর হেলিপ্যাড, সিএন্ডবি, রেলগেট, হাবাসপুর, গোপালপুর, কাঁকনহাট, মহিশালবাড়ী, বসন্তপুর, চর আষাড়িয়াদহ ও পিরিজপুরসহ অন্তত ৫০টি এলাকা পরিণত হয়েছে টমেটো পাঁকানোর অস্থায়ী হাবে। কাঁচা টমেটো রোদে শুকানো হচ্ছে, আবার খড় দিয়ে ঢেকে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই লাল রং ধারণ করা এসব টমেটো পাঠানো হচ্ছে নাটোর, বগুড়া, নওগাঁ, ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

এই টমেটো ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে অস্থায়ী ঘর তুলে বা ভাড়া নিয়ে ফাঁকা জমি বর্গা করে টমেটো পাঁকানোর কাজ করছেন। ফলে শুধু টমেটো মৌসুমেই গোদাগাড়ীতে অস্থায়ীভাবে ৯ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, বছরে দুই দফা টমেটো চাষ হয় এখানে, যার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন টমেটো সবচেয়ে লাভজনক। এ বছর কিছু গ্রীষ্মকালীন টমেটো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মরিয়ম আহমেদ বলেন, গোদাগাড়ীতে টমেটো চাষ এখন শুধু কৃষি নয়, একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। শত শত কোটি টাকার বাণিজ্যের পাশাপাশি হাজারো মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থান হচ্ছে। তবে কোল্ড স্টোরেজ, পরিকল্পিত বাজারব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে এই নীরব বিপ্লব টেকসই হবে না।

টমেটোর রাজ্যে তাই আজ একদিকে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের জোয়ার, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা, মূল্যঝুঁকি ও কৃষকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এই বৈপরীত্যই গোদাগাড়ীর টমেটো বিপ্লবের অদৃশ্য সংকট।

টমেটোর রাজ্যে নীরব বিপ্লব-গোদাগাড়ীতে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
www.dailyupochar.com
৩০ জানুয়ারি ২০২৬