রবিবার , ০৯ আগস্ট ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদদল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?

favicon
বিশেষ প্রতিবেদক :
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?

চব্বিশের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আকস্মিক ঘোষণা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে তার দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরুর ঘটনাটি বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনকে এক নতুন ও চরম উত্তেজনাকর মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির দিন গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা। আর ঠিক এই যুগসন্ধিক্ষণেই বাংলাদেশে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিষেধাজ্ঞার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় কাঠগড়ায় উঠতে যাচ্ছে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটি।

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বিতর্কিত ও যুগান্তকারী সংশোধনী এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচন কমিশনের দলীয় নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির বিচারের অগ্রগতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের মতো অত্যন্ত স্পষ্ট ও পেশাদার ভঙ্গিতে জানান, একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিবিড় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩, রোম স্ট্যাটিউট এবং সন্ত্রাস দমন আইনের কঠোর কাঠামোগুলোকে সামনে রেখে দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ফরেনসিক ও বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দাপ্তরিক এই ইনভেস্টিগেশনে যদি সংগঠনগতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দলটির সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী দলটিকে আনুষ্ঠানিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলকে আদালতের মাধ্যমে বিচার ও নিষিদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট কোনো নজির অতীতে ছিল না। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে নাৎসি পার্টির বিচার ও তৎপরতা দমনের ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, যদি রাষ্ট্রপক্ষ যথাযথ তথ্য-উপাত্ত, নিখুঁত ফরেনসিক প্রমাণ এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দলটির অপরাধগুলো বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে পারে, তবে এর আইনগত বৈধতার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক নৈতিক যুক্তি দাঁড় করানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তার মতে, এর জন্য প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং বিশ্ব জনমত তৈরি করার সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ও আইনি কৌশল।

তবে ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দলের বিচার প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি মো. মনসুরুল হক চৌধুরীর মতে, ট্রাইব্যুনাল আইনে রাজনৈতিক দলের বিচারের এখতিয়ার যুক্ত করার পদক্ষেপটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। দলীয় কাঠামোর ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা আদালতের সামনে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা একটি অত্যন্ত জটিল ও কষ্টসাধ্য আইনি প্রক্রিয়া। তার দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ব্যক্তির অপরাধের বিচার অনিবার্য হলেও একটি বিশাল রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে ঢালাওভাবে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে রাখা সংবিধান ও সুস্থ গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী, যা ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

এদিকে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের নেপথ্যের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জোরালো অবস্থান হলো-বর্তমান ভূরাজনীতি ও জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের পক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কামব্যাক করা এক প্রকার অসম্ভব। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া 'সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬'-এর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে আরও পাকাপোক্ত করা হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারি এবং আইনি লড়াইয়ের মারপ্যাচে আওয়ামী লীগের এই বিচারিক প্রক্রিয়া কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি লড়াই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে চলেছে।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
www.dailyupochar.com
০৮ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উপচার
 রবিবার , ০৯ আগস্ট ২০২৬
হোমআজকের শীর্ষ সংবাদদল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?

favicon
বিশেষ প্রতিবেদক :
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?

চব্বিশের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আকস্মিক ঘোষণা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশে তার দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম শুরুর ঘটনাটি বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনকে এক নতুন ও চরম উত্তেজনাকর মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির দিন গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা। আর ঠিক এই যুগসন্ধিক্ষণেই বাংলাদেশে দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিষেধাজ্ঞার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় কাঠগড়ায় উঠতে যাচ্ছে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলটি।

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের বিতর্কিত ও যুগান্তকারী সংশোধনী এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও নির্বাচন কমিশনের দলীয় নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটির বিচারের অগ্রগতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের মতো অত্যন্ত স্পষ্ট ও পেশাদার ভঙ্গিতে জানান, একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিবিড় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩, রোম স্ট্যাটিউট এবং সন্ত্রাস দমন আইনের কঠোর কাঠামোগুলোকে সামনে রেখে দলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত সমস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ফরেনসিক ও বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দাপ্তরিক এই ইনভেস্টিগেশনে যদি সংগঠনগতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দলটির সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী দলটিকে আনুষ্ঠানিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলকে আদালতের মাধ্যমে বিচার ও নিষিদ্ধ করার সুনির্দিষ্ট কোনো নজির অতীতে ছিল না। তবে বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে নাৎসি পার্টির বিচার ও তৎপরতা দমনের ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, যদি রাষ্ট্রপক্ষ যথাযথ তথ্য-উপাত্ত, নিখুঁত ফরেনসিক প্রমাণ এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দলটির অপরাধগুলো বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করতে পারে, তবে এর আইনগত বৈধতার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক নৈতিক যুক্তি দাঁড় করানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। তার মতে, এর জন্য প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া এবং বিশ্ব জনমত তৈরি করার সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ও আইনি কৌশল।

তবে ট্রাইব্যুনালে রাজনৈতিক দলের বিচার প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি মো. মনসুরুল হক চৌধুরীর মতে, ট্রাইব্যুনাল আইনে রাজনৈতিক দলের বিচারের এখতিয়ার যুক্ত করার পদক্ষেপটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। দলীয় কাঠামোর ভেতরে কোনো সিদ্ধান্ত থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা আদালতের সামনে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা একটি অত্যন্ত জটিল ও কষ্টসাধ্য আইনি প্রক্রিয়া। তার দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ব্যক্তির অপরাধের বিচার অনিবার্য হলেও একটি বিশাল রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে ঢালাওভাবে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে রাখা সংবিধান ও সুস্থ গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী, যা ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

এদিকে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের নেপথ্যের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জোরালো অবস্থান হলো-বর্তমান ভূরাজনীতি ও জনআকাঙ্ক্ষার বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের পক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে কামব্যাক করা এক প্রকার অসম্ভব। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া 'সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬'-এর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে আরও পাকাপোক্ত করা হয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারি এবং আইনি লড়াইয়ের মারপ্যাচে আওয়ামী লীগের এই বিচারিক প্রক্রিয়া কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি লড়াই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতেও একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে চলেছে।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার: কতখানি বাস্তবসম্মত ও চ্যালেঞ্জিং?
◀ বিস্তারিত কমেন্ট ▶
www.dailyupochar.com
০৮ আগস্ট ২০২৬